• Image 01
  • Image 02
  • Image 03

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এক মহান যুদ্ধ

গ্রামীণ ব্যাংক

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এক মহান যুদ্ধ

রানি সোফিয়া | তারিখ: ২৫-১১-২০১২

রানি সোফিয়াদারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ক্ষুদ্রঋণ হয়ে উঠেছে একটি জাদুশব্দের মতো। গ্রামীণ ব্যাংক ও অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ভূষিত হয়েছেন নোবেল পুরস্কারে। স্পেনের রানি সোফিয়া শোনাচ্ছেন কীভাবে একজন ব্যক্তি ও একটি ধারণা সারা দুনিয়ায় হয়ে উঠল এক স্বপ্নময় আশার আলো।

কারোরই এতে কোনো সন্দেহই নেই যে জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার জন্য ক্ষুদ্রঋণ অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষঙ্গ। জাতিসংঘের অন্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের অবস্থান সবার ওপরে। যেসব মানুষের দৈনিক উপার্জন এক ডলারেরও কম, ২০১৫ সালের মধ্যে তাদের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের উদ্দেশ্য।
ক্ষুদ্রঋণে স্পেনের আস্থা গভীর। সে আস্থা বোঝা যাবে এই তথ্য থেকে যে যেসব দেশ ক্ষুদ্রঋণে অনুদান দিয়ে থাকে মাত্র ১০ বছরে স্পেন তাদের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। ক্ষুদ্রঋণ খাতে স্পেনের এ পর্যন্ত দেওয়া অর্থের পরিমাণ সাত কোটি ১৩ লাখ ইউরো। অন্যান্য দাতাগোষ্ঠী এবং হাজারো মানুষের প্রতিদিনের প্রয়াসের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্পেন বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকদের জাল পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছে। এই কাজকে আমরা দায়িত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছি।

এখনো আমাদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আবার এ কথাও সত্য যে বিগত দশকগুলোতে অনেকগুলো লক্ষ্য আমরা অর্জনও করেছি। ক্ষুদ্রঋণের নীতি ও ধারণাটি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে সে অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য অধ্যাপক ইউনূসের আমন্ত্রণে ১৫ বছর আগে আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। এই কার্যক্রম থেকে সুফল পাওয়া কিছু মানুষের সঙ্গে, মূলত কিছু নারীগ্রাহককে আমার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ ঘটেছিল। ওই নারীগ্রাহকেরা আমাকে জানিয়েছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা ও সহায়তা তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের প্রাত্যহিক জীবনে কী গুরুত্ব বহন করছে। বাংলাদেশ সফরের প্রথম সেই অভিজ্ঞতার এক বছর পর আমি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ক্ষুদ্রঋণ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করি। পরবর্তীকালে ১৯৯৯ সালে আইভরি কোস্ট, ২০০৬ সালে কানাডা এবং সর্বশেষ ২০১১ সালে ভ্যালাডোলিডে অনুষ্ঠিত সম্মেলনেও আমার অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। এর প্রতিটিতে ক্ষুদ্রঋণের ক্রমাগত বিবর্তনের ব্যাপারে আমি আমার আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হই।


ন্যায় ও যথাযথ স্বীকৃতির দায়িত্ব থেকে প্রত্যয়ের সঙ্গে আমি বলতে চাই যে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসই সেই ব্যক্তি, যিনি বহু বছর আগে বাংলাদেশে নতুন এই পথের সূচনা করেছিলেন। আর তাঁর দেখানো পথ পাড়ি দিয়েই স্পেনসহ বিশ্বের বহু দেশে আজ ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্র অর্থায়নের এক সফল বিস্তার ঘটেছে। তাঁর এই অবদানের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অধ্যাপক ইউনূস একজন সমীহ-জাগানো আদর্শ ব্যক্তিত্ব। দারিদ্র্য বিমোচনে তাঁর পদক্ষেপের কারণে তিনি অসংখ্য মানুষের অভিনন্দনের পাত্রে পরিণত হয়েছেন।
গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনার প্রত্যক্ষ দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকে অধ্যাপক ইউনূস ক্ষুদ্রঋণনীতির নতুন পথরেখা উন্মোচনের কাজে মন দিয়েছেন। অধ্যাপক ইউনূস এখন চলে এসেছেন বিশ্বব্যাপী সামাজিক ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে। এর উদ্দেশ্য ব্যক্তি খাত—বিশেষ করে কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয়, ফাউন্ডেশন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে তাদের সামাজিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা।

বিশেষ সেই মুহূর্তকে আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে চাই, নরওয়ের নোবেল কমিটি যখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করল। এই নোবেল শান্তি পুরস্কার শুধু দারিদ্র্য বিমোচনে তাঁর অবদানের জন্যই ছিল না, ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি জানানোর জন্যও। প্রকৃতপক্ষে এটিই ক্ষুদ্রঋণের মূল মর্মবাণী। ক্ষুদ্রঋণ সামাজিক অগ্রগতি ও ন্যায়বিচারের হাতিয়ার এবং মানবিক স্বভাবের ওপর আস্থা রেখে সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি উত্তম ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
রানি সোফিয়া, স্পেন

Source: www.prothom-alo.com